করোনাভাইরাস লক্ষ্মণ, চিকিৎসা ও সুরক্ষার উপায় কী?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আপনার করণীয়

ইদানিং ফেসবুকে করোনাভাইরাস ইস্যুতে অনেকেই অদ্ভুত সব উপদেশ ইউনিসেফের নাম করে ছড়িয়ে যাচ্ছেন। গোড়াতে ব্যাপারটাকে আমি অতটা পাত্তা দেইনি- ভেবেছিলাম কয়েকদিন শেয়ার হওয়ার পর থেমে যাবে। কিন্তু এর কোন লক্ষণই দেখছি না- মানুষজন এগুলো ক্রমাগত শেয়ার দিয়েই চলেছেন। তখন ভাবলাম পোস্টটার দিকে একটু ভাল করে তাকাই।

এই পোস্টে দেওয়া প্রথম উপদেশ

করোনাভাইরাস নাকি বিশাল সাইজের ভাইরাস, যার “কোষের প্রস্থ” চারশ’ থেকে পাঁচশ’ মাইক্রোমিটার। তাই বাজারে যে সাধারণ মাস্ক পাওয়া যায়- সেটাকে নাকেমুখে লাগিয়ে ঘুরলেই ব্যাটা আর কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

এই জিনিস যারা লিখেছেন বা বিশ্বাস করে শেয়ার করছেন, আমি একশভাগ নিশ্চিত তারা ভাইরাস, কোষ, মাইক্রোমিটার- এই শব্দগুলোর অর্থ জানেন না।

প্রথম কথা, ভাইরাসের কোষ বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় কথা, পাঁচশ মাইক্রোমিটার মানে আধা মিলিমিটার। তার মানে এদের কথা অনুসারে ভাইরাসগুলোকে খালি চোখে দেখতে পাওয়ার কথা।

করোনাভাইরাসের আসল আকার সর্বোচ্চ একশ’ ষাট ন্যানোমিটার- অর্থাৎ এক মিলিমিটারের মোটামুটি ছ’হাজার ভাগের এক ভাগ। একে খালি চোখ দূরে থাক, সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও দেখা যায় না।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে, খবরে নিশ্চয়ই দেখেছেন। এটা দেখে আতঙ্কে অধীর হওয়ার কিছু নেই। যে তিনজন অসুস্থ, তাদের দু’জনই ইতালি ফেরত, এবং তৃতীয় জন এক পরিবারের সদস্য। তার মানে এরা ইতালি থেকে এই ভাইরাস নিয়ে এসেছেন এবং পরিবারের সদস্যের মধ্যে ছড়িয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে এখনো এই ভাইরাস বসতি গড়েছে- এমন কোন প্রমাণ নেই। প্রমাণ পাওয়া গেলেও ভয় পাবেন না, কারণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও যে মৃত্যু বা সাংঘাতিক অসুখ হবে, এরকম সম্ভাবনা খুবই কম।

করোনাভাইরাস লক্ষ্মণ, চিকিৎসা ও সুরক্ষার উপায় কী?

কিন্তু তার মানে এই নয় যে ব্যাপারটা সম্পর্কে আমাদের আদৌ কোন সতর্কতার দরকার নেই। সাধারণ মানুষের জন্য এটা অতটা ক্ষতিকর না তা ঠিক, কিন্তু বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা খারাপ দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বয়স্ক মানুষ আমাদের কার পরিবারে নেই বলুন। তার ওপর দেশভর্তি ডায়াবেটিসের রোগী- এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

এখানেই ঝামেলার শেষ নয়। আমরা এমনিতেই গরীব দেশ। এই প্রেক্ষিতে যদি হঠাৎ করে লাখ লাখ মানুষ ভাইরাস নিয়ে হাসপাতালগামী হতে শুরু করে, আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ পড়বে। এর ফলে করোনাভাইরাস সহ অন্যান্য অনেক রোগে আক্রান্ত মানুষ যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। এটা কম কথা নয়।

কাজেই করোনাভাইরাস ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের প্যানিক করলেও হবে না, আবার গা এলিয়ে দিলেও হবে না। মোটামুটি বাস্তববুদ্ধি মোতাবেক সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে।

এই প্রেক্ষিতে যখন দেখি- মানুষজন ভাইরাস মোকাবেলা বিষয়ে মনের আনন্দে ভুয়া খবর ইউনিসেফের নাম করে ছড়িয়ে যাচ্ছেন- একজন অণুজীব বিজ্ঞানী এবং প্রাক্তন জনস্বাস্থ্য গবেষক হিসেবে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়। চলতি জীবনের যেকোন সমস্যা জটিলতর করার জন্য ফেসবুকের কোন জুড়ি নেই। সেটা যে অসুখবিসুখের মত ব্যাপারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তা বুঝিনি।

চলুন এই পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আসলে কী করা উচিত, তাই দেখে আসি।

প্রথমে আসি মাস্ক পড়ার ব্যাপারে- কারণ এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ধারণা দেখতে পাচ্ছি।

করোনাভাইরাস লক্ষ্মণ, চিকিৎসা ও সুরক্ষার উপায় কী?

প্রথমত, ফার্মাসিগুলোতে যেসব একদিকে নীল আরেকদিকে সাদা রঙের মাস্ক পাওয়া যায়- সেটা পড়ে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আপনার কোন লাভ হবে না। এর কারণ, এই মাস্কের ছিদ্রের আকার কমসে কম ষোলহাজার ন্যানোমিটারের মত। অন্যদিকে করোনাভাইরাসের আকার মোটে একশ’ ষাট ন্যানোমিটার। সে এই মাস্কের ফুটো ভেদ করে হাসতে হাসতে ঢুকে যাবে।

কিন্তু সেটা আপাতত বাদ দেই। আসল কথা হল- করোনাভাইরাস থেকে যদি নিজেকে রক্ষা করতে চান, তাহলে আপনার জন্য মাস্ক পড়ে সেরকম লাভ নেই। তা সে যে ধরণের মাস্কই হোক।

এর কারণ, ভাইরাসটার পাখা নেই। সে বাতাসে উড়ে উড়ে যেতে পারে না। তাহলে ছড়ায় কীভাবে? করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী যদি হাঁচি বা কাশি দেন, তাহলে তাদের নাক-মুখ থেকে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির কণা বের হয়, সেটার পিঠে ভর করে সে বুলেটের মত ফুট ছয়েক যেতে পারে। কিন্তু তার এই সাধ্যি নেই যে কণাগুলো থেকে বের হয়ে সে মাইলের পর মাইল বাতাসে ভেসে বেড়াবে।

তার মানে- যদি করোনাভাইরাস রোগী আপনার ধারেকাছে না থাকেন এবং মুখের ওপর হাঁচি-কাশি না দেন, তাহলে বাতাস থেকে এই ভাইরাস পাওয়ার কোন সম্ভাবনা আপনার নেই। কাজেই শহরের মধ্যে হেঁটে বেড়ানোর সময় খামোখা সঙ-এর মত মাস্ক মুখে লাগাবেন না।

তবে একটা ক্ষেত্রে মাস্ক পড়ে লাভ আছে, সেটা এরকম। আপনি নিজে যদি করোনাভাইরাস রোগী হন, এবং অন্যদেরকে আপনার সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে চান, সে ক্ষেত্রে মুখে মাস্ক লাগাতে পারেন। তবে এক্ষেত্রেও ঐ নীল-সাদা ফ্যাশনের মাস্ক পরে লাভ নেই। ভাইরাস ঠেকানোর জন্য একটা বিশেষ মাস্ক লাগে, তাকে বলে N95 রেস্পিরেটর। এটা পরা খুব সহজ ব্যাপার নয়, কারণ এর দেওয়াল বেশ মোটা এবং মুখে লাগালে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। এমনিতে আপনি বড়জোর আধঘন্টা মুখে এটা লাগিয়ে রাখতে পারবেন। কিন্তু সারাদিন ঘন্টার পর ঘন্টা এটা আটকে ঘোরার জো নেই। কেন খামোখা এত ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যাবেন বলুন। নাক চুলকোলে তখন?

সত্যিই যদি করোনাভাইরাসকে ঠেকাতে চান, ওসব মাস্ক-টাস্কের দিকে না গিয়ে নিচের ব্যাপারগুলো করুন

১। প্রথমত, লোকসমাগম বা ভিড় যদ্দূর সম্ভব পরিহার করার চেষ্টা করুন। দেশের মানুষের অতটা মুখে হাত দিয়ে হাঁচি-কাশি দেওয়ার অভ্যাস নেই, তা করোনাভাইরাস আসুক আর যাই হোক। কাজেই কখন কে আপনার তিন ফুটের মধ্যে করোনাভাইরাস-অলা একটা হ্যাঁচ্চো দিয়ে বসে, তার ওপর আপনার সেরকম নিয়ন্ত্রণ নেই। ঝামেলা এড়াতে তাই যতদূর সম্ভব ভিড়বাট্টা থেকে দূরে থাকুন। জানি এটা বলা সহজ হলেও করা কঠিন, তবে চেষ্টা করুন পাবলিক বাস-টাসে একটু কম উঠতে। বিশেষ করে যদি আপনার সর্দিকাশি জাতীয় কিছু হয়- সম্ভব হলে স্কুলকলেজ অফিস দিন।

২। যদি দেখেন আপনার আশেপাশে কেউ হাঁচি-কাশি দিচ্ছে, তার থেকে ফুটছয়েক দূরে চলে আসুন।

দেখুন, মানসম্মান, ভদ্রতা- এই জিনিসগুলোর একটা স্থান-কাল আছে। এই মুহূর্তে হয়ত দেশের মধ্যে নতুন একটা ভাইরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার টিকাই এখনো আবিষ্কার হয়নি- এটা ভদ্রতা দেখানোর সময় নয়। আপনার এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব আপনার হাতে। কাজেই কে কী ভাবল কিছু মনে করবেন না, বিন্দুমাত্র সঙ্কোচ না করে হাঁচি-কাশিঅলার কাছ থেকে দূরে চলে আসুন।

৩। আপনার যদি বাইরে হাঁচি-কাশি পায়, তাহলে কনুইয়ের ভাঁজে হাঁচি-কাশি দেবার একটা অভ্যাস করে ফেলুন। হাতের মধ্যে দিলে ভাইরাসগুলো সব হাতেই যাবে। সেই হাত দিয়ে কারো সাথে হ্যান্ডশেক করা মানে তার হাতও ভাইরাসে লেপ্টে দেওয়া।

করোনাভাইরাস লক্ষ্মণ, চিকিৎসা ও সুরক্ষার উপায় কী?

আগেই বললাম এখন ঠিক ভদ্রতার সময় নয়। কাজেই কাউকে যদি দেখেন রাস্তাঘাটে খুব আয়োজন করে জোরসে হাঁচি-কাশি দিচ্ছেন- তাকে একটু পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুন।

৪। চার নম্বর উপদেশটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারে ছোট ছোট বোতলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে পাওয়া যায়। এগুলোর একটা সবসময় সাথে রাখার অভ্যাস করুন। বাসের সিট বা রাস্তার রেলিং জাতীয় কোথায় হাত পড়লে সাথে সাথে এটা দু’হাতে ভাল করে মাখিয়ে নিন। ভাইরাস ছড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হল সন্দেহজনক কোথায় হাত লাগানো, তারপর সেই হাত নাকে-মুখে-চোখে দেওয়া। এটা করার মানে হল ভাইরাসকে তোয়াজ করে বলে- আয়রে ব্যাটা আমার ফুসফুসে আয়। এজন্য ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করার একটা অভ্যাস গড়ে তুলুন।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার কেনার সময়ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশানের পরামর্শ হল কমপক্ষে ষাট শতাংশ অ্যালকোহলওয়ালা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। ডেটল আর লাইফবয়- দু’টোতেই যথেষ্ট অ্যালকোহল থাকে, কাজেই এদেরকে স্বচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারেন।

মনে রাখবেন, করোনাভাইরাস ঠেকানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে ঘন ঘন হাত পরিষ্কার রাখা। এটা নিয়ে একটা চমৎকার শিক্ষণীয় কাহিনী আছে।

আজ থেকে আঠেরো বছর আগে এই ভাইরাসেরই এক ভাইবেরাদার চায়নাতে সার্স রোগের প্রকোপ সৃষ্টি করেছিল।

করোনাভাইরাস আসার সাথে সাথেই কর্তৃপক্ষ চায়নার বিভিন্ন প্রদেশে মোটামুটি তালাচাবি দিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু সেই সার্স প্রাদুর্ভাবের সময়টাতে বেইজিং এর একটা স্কুল খোলা ছিল। সেই স্কুলের হর্তাকর্তা তাদের বাচ্চাদের জন্য একটা বিশেষ নিয়ম জারি করলেন- প্রত্যেককে ঘন ঘন ক্লাসরুমের বেসিনে হাত ধুতে হবে। শুধু ধুলেই হবে না, হাত ধোয়ার সময় একটা গানও গাইতে হবে- যাতে অন্তত সেকেন্ড ত্রিশেক ধরে তারা ভালমত হাতটা ধোয়।

এই অভ্যাসটা করার পর দেখা গেল, স্কুলের ঐ বাচ্চাদের সার্স তো হলই না, এর পরের কয়মাস তাদের কোন অসুখই হল না। পেটখারাপ, সর্দিকাশি কিছুই না।

একটা কথা মনে রাখবেন। করোনাভাইরাসের প্রকোপ বন্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে বাস্তববুদ্ধি বা কমন সেন্স। এর সমাধান প্যানিক করা নয়, অফিস-আদালত বন্ধ করা নয়, ফালতু উপদেশ শেয়ার করা নয়, আবার একদম পাত্তা না দিয়ে বসে থাকাও নয়। জীবন সাধারণভাবেই কাটাবেন, ভিড়বাট্টা থেকে দূরে থাকবেন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবান-পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার রাখবেন, আর পরিবারের অসুস্থ কিংবা বৃদ্ধদের ওপর নজর রাখবেন।

আমরা সবাই নিজেদের জায়গা থেকে এতটুকু করলেই যথেষ্ট। বাকিটা উপরঅলার হাতে ছেড়ে দিন।

Stay active and updated with the AllEducationResult.Com family to get all the information about Education and Job. Like our Facebook page to get all the updates and join our Facebook group.
Updated: September 14, 2021 — 1:49 pm